ইসলাম ধর্মে হজ একটি মহান ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির পথ। এটি কেবল একটি ধর্মীয় রীতি নয়, বরং আত্মত্যাগ, ধৈর্য, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রতীক। হজ পালনের মাধ্যমে একজন মুমিন ব্যক্তি তার জীবনের পাপমুক্তি, তাকওয়া বৃদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুযোগ পান। আজকের আর্টিকেলে আমরা— হজ পালন সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো। চলুন শুরু করা যাক।
হজ : ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের তাৎপর্য, নিয়ম ও উপকারিতা
হজ কী?
“হজ” শব্দটি আরবি “حَجّ” থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো— ইচ্ছা করে গমন করা বা কোনো মহান উদ্দেশ্যে সফর করা। ইসলামী পরিভাষায়, হজ হলো—নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী কাবা শরীফ এবং অন্যান্য নির্ধারিত স্থানে নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করা।
হজের গুরুত্ব ও কুরআন-সুন্নাহর দলিল
কুরআনে বলা হয়েছে:
“…ওয়ালিল্লাহি আলান্নাসি হিজ্জুল বাইতি মানিস্তাত্তা ইলাইহি সাবীলা…” (সূরা আলে ইমরান ৩:৯৭)
অর্থ: “যার সামর্থ্য আছে, তার জন্য আল্লাহর ঘরের হজ করা ফরজ।”
রাসূল (সা.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি হজ করল এবং অশ্লীলতা ও পাপ থেকে বিরত থাকল, সে নবজাত শিশুর মতো পাপমুক্ত হয়ে ফিরে আসে।” (সহিহ বুখারী ও মুসলিম)
#আরও পড়ুন: শাওয়াল মাসের ছয় রোজা ও কাজা রোজা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন!
হজ কখন ফরজ হয়?
নবম হিজরিতে যখন হজের মৌসুম আসে তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু বকর (রা.) কে হজ কাফেলার আমির বানিয়ে পাঠালেন। সেবারের হজ কাফেলায় মোট ৩০০ মুসলিম অংশ নেন। এর আগে মুসলিমদের ওপর হজ ফরজ ছিল না।
সামর্থবান সুস্থ মানুষের ওপর হজ ফরজ করে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেন, وَمَنۡ دَخَلَہٗ کَانَ اٰمِنًا ؕ وَلِلّٰہِ عَلَی النَّاسِ حِجُّ الۡبَیۡتِ مَنِ اسۡتَطَاعَ اِلَیۡہِ سَبِیۡلًا ؕ وَمَنۡ کَفَرَ فَاِنَّ اللّٰہَ غَنِیٌّ عَنِ الۡعٰلَمِیۡنَ
“যে তাতে (বায়তুল্লাহয়) প্রবেশ করে, সে নিরাপদ হয়ে যায়। মানুষের মধ্যে যারা সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে, তাদের ওপর আল্লাহর জন্য এ ঘরের হজ করা ফরজ। কেউ (এটা) অস্বীকার করলে সে জেনে রাখুক, নিশ্চয় আল্লাহ্ সৃষ্টিজগতের মুখাপেক্ষী নন।” (সূরা আলে ইমরান ৩:৯৭)
এ আয়াতটি নবম হিজরির শেষ দিকে নাজিল হয়েছে। অতএব, নবম হিজরির শেষ দিকে হজ ফরজ হয়েছে। (যাদুল মাআদ ৩-৫৯৫)
হযরত আবু বকর (রা.) সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে হজের সফরে রওনা করার পর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর সূরা তাওবাহ অবতীর্ণ হয়। ওই সূরায় মুশরিকদের সাথে থাকা শান্তি চুক্তি তারা ভঙ্গ করতে পারে- আল্লাহ তাআলা প্রিয় হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সে ব্যাপারে সতর্ক করেন। নির্দেশ দেন আজকের পর থেকে মুশরিকরা হারাম শরিফের সীমানায় প্রবেশ করতে পারবে না। কেউ যেন হারাম মাসগুলোতে যুদ্ধের আশঙ্কা না করে।
তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী (রা.) কে ডাকলেন, বললেন, সূরা তাওবায় হজ বিষয়ে যে বিধান ঘোষণা করা হয়েছে, তা মুসলিমদের জানিয়ে দাও। তখন আলী (রা.) মিনায় সমবেত মুসলিমদের মধ্যে মুশরিকদের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে দিলেন।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে সেদিন তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে তিনি বলেছিলেন, কোনো কাফের জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আজকের পর কোনো মুশরিক হজ করতে পারবে না। বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করতে পারবে না। মুশরিকদের সাথে মুসলিমদের শান্তিচুক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত বহাল ছিল যতক্ষণ তারা তা ভঙ্গ করেনি।
হযরত আলী (রা.) আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উটনীর ওপর আরোহণ করে বের হলেন। পথিমধ্যে তাঁর দেখা হলো হযরত আবু বকর (রা.) এর সাথে। তখন আবু বকর (রা.) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি আমির নাকি মামুর (আমিরের তত্ত্বাবধানে)? আলী (রা.) উত্তর দিলেন, আমি মামুর; আল্লাহর রাসূল আমাকে কিছু বিধান দিয়ে পাঠিয়েছেন।
ফের এই দুই মহান সাহাবি সামনে অগ্রসর হলেন। হযরত আবু বকরের তত্ত্বাবধানে মুসলিমরা হজ করলেন। আর কোরবানির দিন মিনায় হজরত আলী (রা.) আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে সবাইকে দিকনির্দেশা দিলেন ও নতুন বিধান সম্পর্কে জানালেন। এভাবেই মুসলিমরা নবম হিজরিতে প্রথমবারের মতো ফরজ হজ পালন করলেন।
হজের ফরজ ৩টি:
- ইহরাম বাঁধা – নির্দিষ্ট নিয়তের মাধ্যমে হজ শুরু করা।
- আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা (৯ জিলহজ)।
- তাওয়াফে জিয়ারত – ঈদের পর নির্দিষ্ট সময়ে কাবা শরীফ প্রদক্ষিণ করা।
হজের প্রকারভেদ:
হজ তিন প্রকার। যথা: ইফরাদ, কিরান ও তামাত্তু। শুধু হজের ইহরামের নিয়ত করে তা সম্পন্ন করলে একে ‘ইফরাদ হজ’ বা একক হজ বলা হয়। হজ ও ওমরাহর জন্য একত্রে ইহরামের নিয়ত করে একই ইহরামে তা সম্পন্ন করলে তাকে ‘কিরান হজ’ বা যৌথ হজ বলা হয়। একই সফরে প্রথমে ওমরাহর ইহরামের নিয়ত করে, তা সম্পন্নপূর্বক হজের জন্য নতুন করে ইহরামের নিয়ত করে তা সম্পাদন করাকে ‘তামাত্তু হজ’ বা সুবিধাজনক হজ বলা হয়।
হজের প্রধান কার্যক্রম:
- ইহরাম গ্রহণ (মীকাত থেকে)
- কাবা শরীফে তাওয়াফ
- সাফা-মারওয়ার মধ্যে সাঈ (দৌড়ানো)
- আরাফাতে অবস্থান (ফরজ)
- মুযদালিফায় রাত যাপন ও মাগরিব-ঈশা একত্রে আদায়
- শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ (জামারাহ)
- কুরবানি করা
- চুল কাটা বা মুণ্ডন করা
- তাওয়াফে জিয়ারত ও বিদায়ী তাওয়াফ (তাওয়াফুল বিদা)
হজের মাধ্যমে কী শিক্ষা পাওয়া যায়?
- আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ধৈর্য
- আত্মত্যাগ ও ইখলাস
- উম্মাহর ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ
- দুনিয়া ও আখিরাতের গুরুত্ব অনুধাবন
- নিজেকে শুদ্ধ ও আল্লাহর নিকটবর্তী করা
#আরও পড়ুন: ইয়াসির ইবনে আমির (রা.) : ইসলামের প্রথম শহিদের জীবন ও ত্যাগের অমর কাহিনি!
হজের সময় প্রস্তুতির জন্য কিছু পরামর্শ:
- আর্থিকভাবে প্রস্তুত হোন এবং সুদ থেকে দূরে থাকুন
- শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য চিকিৎসা নিন
- হজের নিয়ম, দোয়া ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ মুখস্থ করুন
- ভ্রমণসঙ্গী ও দল নির্বাচন সচেতনভাবে করুন
- আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে রওনা দিন
শেষ কথা
হজ ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ। যারা হজ পালন করেন, তারা জীবনে এক অনন্য অভিজ্ঞতা লাভ করেন যা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। হজ শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়— এটি একজন মুসলমানের পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ, তওবা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদন। আমাদের উচিত, সুযোগ হলে একবার হলেও হজ পালন করা এবং যারা এখনো যেতে পারেননি, তাদের জন্য দোয়ার মাধ্যমে পাশে দাঁড়ানো।
“হজ পালন করুন— পুনর্জন্মের মতো পবিত্র জীবনের সূচনা করুন।”



