আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একজন ঘনিষ্ঠ সাহাবি। তিনি মক্কার একটি নিঃস্ব, নিপীড়িত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ইয়াসির ইবনে আমির (রা.) এবং মাতা সুমাইয়া বিনতে খাব্বাত (রা.)— দুজনেই ইসলামের জন্য শাহাদাত বরণ করেন। ইয়াসির (রা.) হচ্ছেন ইসলামের প্রথম শহিদ এবং সুমাইয়া (রা.) হচ্ছেন ইসলামের প্রথম মহিলা শহিদা। তাঁদের সন্তান আম্মার (রা.)-ও ইসলামের জন্য শহিদ হন। আজকের আর্টিকেলে আমরা— আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.)-এর জীবনী সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্ঠা করব। চলুন শুধু করা যাক।
আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.) : ইসলামের সাহসী সাহাবিদের একজন
ইসলাম গ্রহণ ও ঈমানের দৃঢ়তা
আম্মার (রা.) কিশোর বয়সেই হিদায়াতের আলো গ্রহণ করেন। যখন রাসূল (সা.) গোপনে ইসলাম প্রচার করছিলেন, তখনই তিনি এবং তাঁর পরিবার ঈমান গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর থেকেই তাঁর জীবনে নেমে আসে চরম নির্যাতন ও জুলুম। কিন্তু তাঁর ঈমান ছিল পাহাড়ের মতো অটল।
নির্যাতনের ইতিহাস
কুরাইশরা তাঁদের পরিবারকে ইসলাম গ্রহণের কারণে নানা নির্মম পন্থায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করত। গরম বালুর ওপর শুইয়ে, পাথর চাপা দিয়ে, লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে আম্মারকে কষ্ট দেওয়া হতো। তাঁর বাবা-মাকে হত্যা করা হয় তাঁর চোখের সামনেই। বিশেষ করে আবু জাহল তাঁর মাকে নির্মমভাবে বর্শা দিয়ে আঘাত করে শহিদ করেন।
#আরও পড়ুন: সূরা আল-ফাতিহা : আরবি, বাংলা উচ্চারণ, ইংরেজি উচ্চারণ এবং অর্থসহ বিশদ ব্যাখ্যা
জুলুমের মুখে এক মুহূর্তের দুর্বলতা
নির্যাতনের এক পর্যায়ে, প্রাণরক্ষার জন্য তাঁকে কুরআনের বিরুদ্ধে কিছু কথা বলিয়ে নেওয়া হয়। পরে কান্নারত অবস্থায় তিনি রাসূল (সা.)-এর কাছে এসে নিজের অবস্থার ব্যাখ্যা করেন। তখন আল্লাহ তা’আলা সূরা নাহলের ১০৬ নম্বর আয়াতে তাঁর অবস্থা হালাল ঘোষণা করেন। এ আয়াতে বলা হয়:
“যে কেউ ঈমান আনার পর কুফর করে, তবে যার হৃদয় ঈমানের প্রতি সুনিশ্চিত, কেবল জুলুমের শিকার হয়ে কুফরের কথা বলেছে, তার কোনো গুনাহ নেই।”
বদর, উহুদ ও খন্দক যুদ্ধে অংশগ্রহণ
আম্মার (রা.) বদর, উহুদ, খন্দকসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ গাজওয়াহতে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন নির্ভীক যোদ্ধা। তাঁর হাতে বহু মুশরিক নিহত হয়। রাসূল (সা.) তাঁকে যুদ্ধে সাহসী ও বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও কুফার গভর্নর
খলিফা উমার ইবনে খাত্তাব (রা.) তাঁকে কুফা শহরের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ করেন। আম্মার (রা.) সেখানে অত্যন্ত সুনামের সাথে এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন একজন নির্লোভ, ন্যায়পরায়ণ ও নিরপেক্ষ শাসক।
শহিদ হওয়া
খলিফা হযরত আলী (রা.)-এর খিলাফতের সময় সিফফিন যুদ্ধে আম্মার (রা.) আলীর পক্ষ থেকে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধ চলাকালেই মুয়াবিয়া (রা.)-এর বাহিনীর হাতে তিনি শহিদ হন। হাদিসে এসেছে,
“হে আম্মার! তোমাকে হত্যা করবে এক জালিম দল।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৪৭)
এই হাদিসটি তাঁর শহিদি মৃত্যুকে একটি ঐতিহাসিক সত্যে পরিণত করেছে।
রাসূলের ভালোবাসা ও মর্যাদা
রাসূল (সা.) তাঁকে ভীষণ ভালোবাসতেন। তিনি বলেছিলেন:
“আম্মার আমার সঙ্গে আছে, আর আমি আম্মারের সঙ্গে আছি।” (তিরমিজি)
তাঁর সাহস, ধৈর্য ও ঈমানের কারণে তিনি সাহাবিদের মাঝে এক বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছেন।
#আরও পড়ুন: ইসলামে যাকাতের উৎপত্তি ও উদ্দেশ্য : কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা!
শিক্ষণীয় দিক
- ইসলামের জন্য সব ধরনের কষ্ট ও ত্যাগ সওয়া ঈমানের পরিপূর্ণতার নিদর্শন।
- ধৈর্য এবং সাহসিকতা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে।
- কষ্টের মাঝে ঈমানকে দৃঢ় রাখা ইসলামের চেতনার অংশ।
- দুনিয়ার যেকোনো অত্যাচার-জুলুমের পরেও জান্নাতই হচ্ছে ঈমানদারদের প্রকৃত ঠিকানা।
শেষকথা
আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.)-এর জীবনের প্রতিটি ধাপ আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার। তিনি শুধু একজন সাহাবি নন, বরং একটি জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর জীবনের ঘটনা প্রমাণ করে, ঈমান মানে শুধু মুখে বলা নয়, বরং তা অন্তরের বিশ্বাস ও জীবন দিয়ে প্রমাণ করার নাম। তাঁর সাহসিকতা, ত্যাগ ও শহিদি মৃত্যু মুসলিম উম্মাহর জন্য চিরন্তন প্রেরণা হয়ে থাকবে।



