হজের ইতিহাস ও পেছনের কাহিনি: আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট!

হজের ইতিহাস ও পেছনের কাহিনি: আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট!

হজ একটি পবিত্র ইবাদত, যা ইসলাম ধর্মের অন্যতম স্তম্ভ। এটি শুধুমাত্র শরীরী ও আর্থিক পরিশ্রম নয়, বরং এক গভীর আত্মিক অভিজ্ঞতা, ইতিহাসের স্মরণ এবং আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের নাম। প্রতি বছর বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম কাবা শরিফ অভিমুখে যাত্রা করেন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায়। তবে এই হজের পেছনে রয়েছে এক বিশাল ইতিহাস, যা নবি ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। আজকের আর্টিকেলে আমরা— হজের ইতিহাস ও পেছনের কাহিনি: আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট; বিস্তারিত জানার চেষ্টা করব। চলুন শুরু করা যাক।

হজের ইতিহাস ও পেছনের কাহিনি: আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

হজের প্রাচীন ইতিহাস: ফিতরাতের ইবাদত

ইসলামের আগমনের বহু পূর্ব থেকেই কাবা ঘর ছিল একটি পূতপবিত্র স্থান। ইসলামিক বর্ণনা অনুযায়ী, মানবজাতির প্রথম নবি আদম (আ.)-কেও কাবা নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে সময়ের ব্যবধানে কাবার কাঠামো হারিয়ে যায় এবং মক্কা পরিণত হয় একটি জনশূন্য, মরুময় উপত্যকায়।

পুনরায় এই ভূমিকে বরকতময় ও কেন্দ্রীয় ইবাদতের স্থানে রূপ দেন নবি ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ.)। কাবা শরিফের বর্তমান রূপ তাদেরই নির্মাণকাজের ফল।

“এবং যখন ইব্রাহিম ও ইসমাঈল কাবার ভিত্তি স্থাপন করছিলেন…” — (সূরা আল-বাকারা: ১২৭)

#আরও পড়ুন: হজ : ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের তাৎপর্য, নিয়ম ও উপকারিতা

ইব্রাহিম (আ.), হাজেরা (আ.) ও ইসমাঈল (আ.)-এর কাহিনি: ত্যাগ, ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল:

হজের আনুষ্ঠানিকতার গভীরে রয়েছে ইব্রাহিম (আ.)-এর পরিবারবর্গের আত্মত্যাগ ও ঈমানদারির এক অমূল্য কাহিনি।

মরুভূমিতে রেখে যাওয়া

আল্লাহর নির্দেশে ইব্রাহিম (আ.) তাঁর নবজাতক পুত্র ইসমাঈল (আ.) এবং স্ত্রী হাজেরা (আ.)-কে নির্জন, বৃক্ষহীন, পানি ও খাদ্যহীন মরুভূমিতে রেখে আসেন। সেই স্থানই ছিল বর্তমান মক্কা নগরীর অঞ্চল। বিদায়ের মুহূর্তে হাজেরা (আ.) জিজ্ঞেস করেন:

“আপনি কি আল্লাহর আদেশে আমাদের এখানে রেখে যাচ্ছেন?”
ইব্রাহিম (আ.) বললেন, “হ্যাঁ।”
তখন হাজেরা (আ.) বললেন: “তাহলে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করবেন না।”
— (বুখারি)

সাফা ও মারওয়া: এক মায়ের আর্তচিৎকার

জমজম কূপ আবিষ্কারের কাহিনিটি শুধু একটি অলৌকিকতা নয়, বরং এটি হাজেরা (আ.)-এর ধৈর্য ও সাহসিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইসমাঈল (আ.)-এর তৃষ্ণায় কাতর অবস্থা দেখে তিনি সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে সাতবার দৌড়াতে থাকেন, পানি খোঁজার জন্য। তখন আল্লাহর রহমতে, ইসমাঈল (আ.)-এর পায়ের নিচে জমজম কূপের পানি নির্গত হয়।

“নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত।” — (সূরা আল-বাকারা: ১৫৮)

কাবা শরিফের পুনঃনির্মাণ ও দাওয়াত:

ইসমাঈল (আ.) যখন প্রাপ্তবয়স্ক হন, তখন পিতা-পুত্র মিলে কাবাঘর পুনরায় নির্মাণ করেন।

তাঁরা নির্মাণকালে দোয়া করেন:
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পক্ষ থেকে এটা কবুল করো। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” — (সূরা বাকারা: ১২৭)

এই নির্মাণকাজ ছিল শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদতের ঘর প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে। কাবা নির্মাণের পর ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে মানুষকে হজের দাওয়াত দেন।

“তুমি মানুষের মাঝে হজের জন্য আহ্বান জানাও, তারা তোমার কাছে আসবে পদব্রজে ও উটসহ বাহনে চড়ে দূর-দূরান্ত পথ পাড়ি দিয়ে।” — (সূরা হজ: ২৭)

এ দাওয়াতের প্রতিধ্বনি আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের অন্তরে বাজে— যারা প্রতি বছর আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দিয়ে হজে যায়।

#আরও পড়ুন: হজের বিভিন্ন স্তম্ভ ও প্রতিটি আমলের পেছনের তাৎপর্য!

ইসলামে হজ ফরজ হওয়ার পটভূমি

ইসলামের প্রাথমিক যুগে হজ ফরজ ছিল না। তবে রাসূলুল্লাহ (সা.) হিজরতের পর হিজরি ৯ম সনে যখন ইসলাম একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে রূপ নেয়, তখন হজ ফরজ হয়।

“মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য এই ঘরের হজ করা ফরজ, যদি সে সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে।” — (সূরা আলে ইমরান: ৯৭)

হজের ফরজ হওয়ার মূল শর্তসমূহ:

১. মুসলিম হতে হবে
২. প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হতে হবে
৩. শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকতে হবে
৪. হজের সময় জীবিত থাকতে হবে

হজের আনুষ্ঠানিকতা ও তাৎপর্য

হজের প্রতিটি রোকন (ধাপ) ইসলামের গভীর অর্থ ও ইতিহাস বহন করে:

ইহরাম গ্রহণ: নিজেকে দুনিয়ার মোহ-মায়া থেকে আলাদা করে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো।

তাওয়াফ: আল্লাহর ঘর কেন্দ্র করে ঘুরে আল্লাহর চারপাশে আত্মসমর্পণ করা।

সাঈ: হাজেরা (আ.)-এর কষ্ট ও বিশ্বাসের অনুসরণ করা।

আরাফাতে অবস্থান: মানবজাতির মহাসম্মেলন, যা হাশরের ময়দানের স্মরণ করিয়ে দেয়।

কঙ্কর নিক্ষেপ: শয়তানের প্রতি ঘৃণা ও প্রতিরোধের প্রতীক।

কুরবানি: ইব্রাহিম (আ.)-এর কুরবানির আত্মত্যাগের স্মরণ।

শেষকথা

হজ এমন এক ইবাদত যা একজন মুসলমানের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এটি আত্মা পরিশুদ্ধ করে, আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালোবাসা বাড়ায়, গুনাহ মাফ করায় এবং মানুষকে অহংকারমুক্ত করে। এটি এমন এক সফর, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে ইতিহাস, প্রতিটি দোয়ায় মর্মস্পর্শী আবেগ এবং প্রতিটি কষ্টে রয়েছে জান্নাতের আশ্বাস।

“যে ব্যক্তি হজ করে এবং অশ্লীল কথা বলে না ও গুনাহ করে না, সে এমনভাবে ফিরে আসে যেন সদ্য জন্ম নেওয়া শিশু।” — (বুখারি ও মুসলিম)

#আরও পড়ুন: স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ও হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা!

হজের ইতিহাস জানলে আমরা বুঝতে পারি, এটি কেবল আচার-অনুষ্ঠান নয়; এটি ইব্রাহিম (আ.), হাজেরা (আ.) ও ইসমাঈল (আ.)-এর মতো বিশ্বাস, ত্যাগ ও আত্মসমর্পণের জীবন্ত শিক্ষা। আল্লাহর পথে চলতে হলে প্রয়োজন সেই একই ত্যাগের মনোভাব। হজ আমাদের শেখায়— আল্লাহকে ভালোবাসার মানে কী, এবং কীভাবে নিজের কামনা-বাসনা ও অহংকারকে কোরবানি করে একজন প্রকৃত মুমিন হওয়া যায়।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন:

Scroll to Top