প্রিয় পাঠক, আসসালামু আলাইকুম। আশা করি, সকলে আল্লাহর অশেষ রহমতে ভালো আছেন। এই আর্টিকেলে আমরা— ঈমান, ইসলাম ও তাকদীর সম্পর্কে হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ করব। এক্ষেত্রে সহিহ মুসলিম শরিফের ১-১০ নং হাদিস নিম্নে ব্যাখ্যা করা হলো।
ঈমান, ইসলাম ও তাকদীর সম্পর্কে হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ [সহিহ মুসলিম ১-১০]
ইয়াহ্ইয়া ইবনু ইয়া‘মার হতে বর্ণিত:
তিনি বলেন, বাসরার অধিবাসী মা‘বাদ জুহাইনাহ্ প্রথম ব্যক্তি যে তাকদীর অস্বীকার করে। আমি ও হুমায়দ ইবনু ‘আবদুর রহমান উভয়ে হাজ্জ অথবা ‘উমরাহ’র উদ্দেশ্যে রওনা করলাম। আমরা বললাম, যদি আমরা এ সফরে রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যেকোনো সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়ে যাই তাহলে ওই সব লোক তাকদীর সম্বন্ধে যা কিছু বলে সে সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞেস করব। সৌভাগ্যক্রমে আমরা ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রা:)-এর মসজিদে ঢুকার পথে পেয়ে গেলাম। আমি ও আমার সাথী তাঁকে এমনভাবে ঘিরে নিলাম যে, আমাদের একজন তাঁর ডান এবং অপরজন তাঁর বামে থাকলাম। আমি মনে করলাম আমার সাথী আমাকেই কথা বলার সুযোগ দেবে। (কারণ আমি ছিলাম বাকপটু)।
আমি বললাম: “হে আবূ ‘আবদুর রহমান! আমাদের এলাকায় এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটেছে, তারা একদিকে কুরআন পাঠ করে, অপরদিকে জ্ঞানের অন্বেষণও করে। ইয়াহ্ইয়া তাদের কিছু গুণাবলীর কথাও উল্লেখ করলেন। তাদের ধারণা (বক্তব্য) হচ্ছে, তাকদীর বলতে কিছু নেই এবং প্রত্যেক কাজ অকস্মাৎ সংঘটিত হয়।”
ইবনু ‘উমার (রা:) বললেন: “যখন তুমি এদের সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, আর আমার সাথেও তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রা:) আল্লাহর নামে শপথ করে বললেন, এদের কারও কাছে যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকে এবং তা দান-খয়রাত করে দেয় তবে আল্লাহ তার এ দান গ্রহণ করবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত সে তাকদীরের ওপর ঈমান না আনবে।
অতঃপর তিনি বললেন, আমার পিতা ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রা:) আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: একদা আমরা রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি আমাদের সামনে আবির্ভূত হলো। তাঁর পরনের কাপড়-চোপড় ছিল ধবধবে সাদা এবং মাথার চুলগুলো ছিল মিশমিশে কালো। সফর করে আসার কোনো চিহ্নও তাঁর মধ্যে দেখা যায়নি। আমাদের কেউই তাঁকে চিনেও না।
অবশেষে সে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে বসলো। সে তাঁর হাঁটুদ্বয় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাঁটুদ্বয়ের সাথে মিলিয়ে দিলো এবং দুই হাতের তালু তাঁর (অথবা নিজের) উরুর ওপর রাখল এবং বলল, হে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমাকে ইসলাম সম্বন্ধে বলুন। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: ইসলাম হচ্ছে এই- তুমি সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোনো ইলাহ (মা‘বুদ) নেই, এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রাসূল, সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, রমজানের সওম পালন করবে এবং যদি পথ অতিক্রম করার সামর্থ্য হয় তখন বাইতুল্লাহর হজ করবে। সে বলল, আপনি সত্যই বলেছেন।
বর্ণনাকারী [‘উমার (রা:) ] বলেন, আমরা তাঁর কথা শুনে আশ্চর্যান্বিত হলাম। কেন না সে (অজ্ঞের ন্যায়) প্রশ্ন করছে আর (বিজ্ঞের ন্যায়) সমর্থন করছে। এরপর সে বলল, আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: ঈমান এই যে, তুমি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাকুল, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর প্রেরিত নবীগণ ও শেষ দিনের ওপর ঈমান রাখবে এবং তুমি তাকদীর ও এর ভালো ও মন্দের প্রতিও ঈমান রাখবে। সে বলল, আপনি সত্যই বলেছেন।
এবার সে বলল, আমাকে ‘ইহসান’ সম্পর্কে বলুন। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: ‘ইহসান’ এই যে, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তাঁকে দেখছো, যদি তাঁকে না দেখো তাহলে তিনি তোমাকে দেখছেন বলে অনুভব করবে।
এবার সে জিজ্ঞেস করল, আমাকে কিয়ামাত সম্বন্ধে বলুন! রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাকারীর চেয়ে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি বেশি কিছু জানে না। অতঃপর সে বলল, তাহলে আমাকে এর কিছু নিদর্শন বলুন।
তিনি বললেন, দাসী তাঁর মনিবকে প্রসব করবে এবং (এককালের) নগ্নপদ, বস্ত্রহীন, দরিদ্র, বকরীর রাখালদের বড়ো দালান-কোঠা নির্মাণের প্রতিযোগিতায় গর্ব-অহংকারে মত্ত দেখতে পাবে। বর্ণনাকারী [‘উমার (রা:) ] বলেন, এরপর লোকটি চলে গেল।
আমি বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে বললেন, হে ‘উমার! তুমি জানো, এ প্রশ্নকারী কে? আমি আরজ করলাম, আল্লাহ ও তাঁর রসূলই অধিক জ্ঞাত আছেন। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তিনি জিবরীল। তোমাদের কাছে তিনি তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন।
(ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ১ম খণ্ড, ১; বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার ১ম খণ্ড, ১)
#আরও পড়ুন: ওহীর সূচনা : আল্লাহ্র রাসূল (সা.)— এর প্রতি কীভাবে ওহী শুরু হয়েছিল?
জ্ঞাতব্য: প্রথম প্রকাশে হাদিসের পরিভাষা-বিষয়ক নীতিমালা এখানে উল্লেখিত হয়েছিল। বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে উক্ত বিষয়টি ‘সহিহ মুসলিম-এর হাদিস বর্ণনার কতিপয় পরিভাষা’ অনুচ্ছেদের পূর্বাংশে আলোচনা করা হয়েছে।
- বাদী মনিবকে প্রসব করবে। এর অর্থ হলো মনিব তার বাদীর সাথে যেরূপ ব্যবহার করে, সন্তানগণ তাদের মাতাদের সাথে সেরূপ ব্যবহার করবে, তারা মাতার বাধ্য থাকবে না। সন্তান মাতার অবাধ্য হবে, স্ত্রীর অনুগত হবে। আরও উল্লেখ করা যেতে পারে যে, শরিয়ত মোতাবেক বিয়ে শাদি করবে না। বাদশাহ ও ধনী ব্যক্তিগণ দাসী ইচ্ছেমতো রাখবে। বাদী-দাসী অধিক কেনাবেচা হবে। সে সময় দাসীকে বিয়ে করবে অথচ সেটা তার মা জানতে পারবে না।
তুচ্ছ লোক বড়ো হয়ে যাবে, দুনিয়ার অবস্থা ব্যবস্থা বদলে যাবে। বড়ো ছোটো হয়ে যাবে, সম্মানী ব্যক্তি অপমানিত হবে। অসম্মানী ব্যক্তি মানের দাবি করবে। যারা এ কাজের উপযুক্ত নয়, তারা সে কাজের মালিক-মুক্তার হয়ে বসবে।
ইয়াহ্ইয়া ইবনু ইয়া‘মার (রা:) হতে বর্ণিত:
তিনি বলেন, মা‘বাদ (আল জুহানী) তাকদীর সম্পর্কে তার মত ব্যক্ত করলে আমরা তা অস্বীকার করি। তিনি (ইয়াহ্ইয়া ইবনু ইয়া‘মার) বলেন, আমি ও হুমায়দ ইবনু ‘আবদুর রহমান আল হিম্ইয়ারী হজ পালন করতে গিয়েছিলাম। এরপর কাহমাস-এর হাদিসের অনুরূপ সনদসহ হাদিসটি বর্ণিত আছে। তবে এ বর্ণনায় কিছু বেশ-কম রয়েছে।
(ই. ফা. ২; ই. সে. ২)
ইয়াহ্ইয়া বিন ইয়া‘মার এবং হুমায়দ ইবনু ‘আবদুর রহমান থেকে হতে বর্ণিত:
তাঁরা উভয়ে বলেন, একদা আমরা ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রা:)-এর সাথে সাক্ষাৎ করি এবং তাঁর কাছে তাকদীর বিষয়ে ওই সকল লোকেরা (মা‘বাদ ও তাঁর অনুসারীরা) যা মন্তব্য করে তা উল্লেখ করি। অতঃপর এ হাদিসটি রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে ‘উমার (রা:)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনাকারীরা যেরূপ বর্ণনা করেছেন ‘আবদুল্লাহ ইবনু বুরাইদাহ্ ঠিক অনুরূপই বর্ণনা করেছেন। অবশ্য এতে শব্দের কম বেশি আছে।
(ই. ফা. ৩; ই. সে. ৩)
উমার (রা:) হতে বর্ণিত:
হাদিসটি ওপরোক্ত হাদিসের অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
(ই. ফা. ৪; ই. সে. ৪)
আবূ হুরাইরাহ্ (রা:) হতে বর্ণিত:
তিনি বলেন, একদা রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লোকেদের নিয়ে বসেছিলেন। এমন সময় একজন লোক এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহ্র রাসূল! ঈমান কি? তিনি বললেন, ঈমান এই যে, তুমি আল্লাহ্, তাঁর ফেরেশতাকুল, তাঁর (নাজিলকৃত) কিতাব, (আখিরাত) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান রাখবে এবং পুনরুত্থান দিবসের ওপরও ঈমান আনবে।
লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রসূল! ইসলাম কি? তিনি বললেন, ইসলাম এই যে, তুমি আল্লার ‘ইবাদাত করতে থাকবে, কিন্তু তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না, ফরজকৃত সালাত কায়েম করবে, নির্ধারিত ফরজ যাকাত আদায় করবে এবং রমজানের সওম পালন করবে।
সে আবার জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! ইহ্সান কি? তিনি বললেন, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে যেন তাঁকে দেখছো; যদি তাঁকে না দেখো তা হলে তিনি তোমাকে দেখছেন (বলে অনুভব করবে)। সে পুনরায় জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহ রাসূল! কিয়ামাত কখন হবে? তিনি বললেন, এ ব্যাপারে যাকে প্রশ্ন করা হয়েছে তিনি প্রশ্নকারীর চেয়ে বেশি কিছু জানেন না।
তবে আমি তোমাকে তার (কিয়ামাতের) কিছু নিদর্শন বলে দিচ্ছি: যখন দাসী তার মনিবকে প্রসব করবে এটা তার নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি। আর যখন বস্ত্রহীন, জুতাহীন (ব্যক্তি) জনগণের নেতা হবে, এটাও তার একটি নিদর্শন। আর মেষ শাবক ও ছাগলের রাখালরা যখন সুউচ্চ দালান-কোঠা নিয়ে পরস্পর গর্ব করবে, এটাও তার একটি নিদর্শন।
প্রকৃতপক্ষে যে পাঁচটি জিনিসের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ রাখেন, কিয়ামাতের জ্ঞান তারই অন্তর্ভুক্ত। অতঃপর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিম্নবর্ণিত আয়াত তিলাওয়াত করলেন,
“আল্লাহর নিকটই কিয়ামাতের জ্ঞান রয়েছে, আর তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং মাতৃগর্ভে কি আছে তা তিনিই জানেন। কোনো প্রাণীই আগামীকাল কী উপার্জন করবে তা জানে না এবং কোন জমিনে সে মৃত্যুবরণ করবে তাও জানে না। বস্তুত, আল্লাহই সব জানেন এবং তিনি সব বিষয়ই অবগত!” (সূরা লুকমান ৩১ : ৩৪)
বর্ণনাকারী বলেন, এরপর লোকটি চলে গেল। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, লোকটিকে আমার নিকট ফিরিয়ে আনো। তাঁরা তাঁকে ফিরিয়ে আনার জন্য গেলেন। কিন্তু কাউকে পেলেন না। তারপর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ইনি জিবরীল (আ:), লোকেদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য এসেছিলেন।
(ই.ফা. ৫, ই. সে. ৫)
#আরও পড়ুন: আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.) : ইসলামের সাহসী সাহাবিদের একজন!
আবূ হাইয়্যান আত্ তাইমী (রা:) হতে বর্ণিত:
আবূ হাইয়্যান আত্ তাইমী (রা:) থেকে উক্ত সনদে অনুরূপ হাদিস বর্ণনা করেছেন। তবে তাঁর বর্ণনায় “দাসী তার মনিব স্বামী জন্ম দেবে” কথাটির উল্লেখ রয়েছে।
(ই. ফা. ৬; ই. সে. ৬)
আবূ হুরায়রাহ (রা:) হতে বর্ণিত:
তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (সাহাবাদের) বললেন, তোমরা আমাকে প্রশ্ন করো। কিন্তু লোকেরা তাঁকে প্রশ্ন করতে সংকোচবোধ করল। বর্ণনাকারী বলেন, এমন সময় এক ব্যক্তি এসে হাঁটুর কাছে বসে বলল: হে আল্লাহর রাসূল! ‘ইসলাম’ কী? উত্তরে তিনি বললেন: “তুমি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে না, সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে এবং রমজানের সওম পালন করবে।” সে বলল, আপনি সত্যই বলেছেন।
লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! ‘ঈমান’ কী? তিনি বললেন, ‘তুমি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাকুল, তাঁর কিতাব, আখিরাতে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ ও তাঁর রসূলগণের প্রতি ঈমান রাখবে। মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত হওয়ার প্রতি ঈমান রাখবে এবং তাকদীরের ওপরও পূর্ণ ঈমান রাখবে।’ সে বলল, আপনি সত্যই বলেছেন।
এবার সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ‘ইহসান’ কি? তিনি বললেন, “তুমি এমনভাবে আল্লাহকে ভয় করো যেন তুমি তাঁকে দেখছো, আর যদি তুমি তাঁকে না দেখো, তাহলে তিনি তোমাকে দেখছেন বলে অনুভব করো”। সে বলল, আপনি সত্যই বলেছেন।
এবার সে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামত কখন হবে? তিনি বললেন, এ ব্যাপারে যাকে প্রশ্ন করা হয়েছে সে প্রশ্নকারীর চাইতে অধিক কিছু জানে না।
তবে আমি তার নিদর্শন ও লক্ষণসমূহ তোমাকে বলে দিচ্ছি: ‘যখন তুমি দেখবে কোনো নারী তার মনিবকে প্রসব করবে’ এটা কিয়ামতের একটি নিদর্শন।যখন তুমি দেখবে, জুতাবিহীন, বস্ত্রহীন, বধির ও বোবা, পৃথিবীতে শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, এটা একটি নিদর্শন। আর যখন তুমি দেখবে মেষ চালকরা সুউচ্চ দালান-কোঠা নিয়ে গর্ব করছে, এটাও কিয়ামতের একটি নিদর্শন।
যে পাঁচটি অদৃশ্য বস্তুর জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, কিয়ামতের জ্ঞান তারই অন্তর্ভুক্ত। অতঃপর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ আয়াত পাঠ করলেন,
“অবশ্যই আল্লাহর নিকটই কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। আর তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন। মাতৃগর্ভে কী আছে তা তিনিই জানেন। কোনো জীবই আগামীকাল কী উপার্জন করবে তা জানে না এবং কোন স্থানে সে মরবে তাও জানে না।” (সূরা লুকমান ৩১ : ৩৪)
তিনি সূরা শেষ পর্যন্ত পাঠ করলেন। এরপর লোকটি চলে গেল।
তখন তিনি [রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)] সাহাবাদের বললেন, তোমরা লোকটিকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনো। অথচ অনেক খোঁজাখুজি করা হলো, কিন্তু তাঁরা তাকে আর পেল না। অতঃপর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ইনি জিবরীল (আ:) তোমরা প্রশ্ন না করায় তিনি চাইলেন যেন তোমরা দ্বীন সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ কর।
(ই. ফা. ৭; ই. সে. ৭)
তাল্হাহ্ ইবনু ‘উবাইদুল্লাহ (রা:) হতে বর্ণিত:
তাল্হাহ্ ইবনু ‘উবাইদুল্লাহ (রা:) বলেন, নাজদের বাসিন্দা এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর খিদমাতে আসলো। তার মাথার চুলগুলো ছিল এলোমেলো ও বিক্ষিপ্ত। আমরা তার গুন গুন আওয়াজ শুনছিলাম, কিন্তু সে কী বলছিল তা বুঝা যাচ্ছিল না। অতঃপর সে রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অতি নিকটে এসে ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: ‘দিন-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সলাত’।
সে বলল, এ ছাড়া আমার কোনো কিছু (সালাত) আছে কি? তিনি বললেন, না, তবে নফল আদায় করতে পারো। এরপর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে যাকাত প্রদানের কথাও বললেন। সে জিজ্ঞেস করল, এ ছাড়া আমার ওপর আরও কোনো কর্তব্য আছে কি? তিনি বললেন, না। তবে নফল দান-সদাকাহ্ করতে পারো। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর লোকটি এ কথা বলতে বলতে চলে গেল, “আমি এর বেশিও করব না, আর কমও করব না।’ তখন রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, লোকটি যদি তার কথার সত্যতা প্রমাণ করতে পারে তাহলে সফলকাম হয়েছে।
(ই. ফা. ৮; ই. সে. ৮)
- ফরজ ব্যতীত যে সব আমল করা হয়, তা ফরজের পরিপূরক ও আমলকারীর মর্যাদা বৃদ্ধি করে।
তালহাহ্ ইবনু ‘উবাইদুল্লাহ হতে বর্ণিত:
তিনি হাদিসটি রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে ইমাম মালিকের বর্ণিত হাদিসের অবিকল বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি এ হাদিসের শেষাংশে বলেছেন, ‘অতঃপর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “সে সফলকাম হয়েছে তার বাবার কসম! যদি সে সত্য কথা বলে থাকে।” অথবা তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করেছে, যদি সে সত্য কথা বলে থাকে।”
(ই. ফা. ৯; ই. সে. ৯)
- তাল্হাহ্ ইবনু ‘উবাইদুল্লাহ (রা:) বলেন, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বাবার নামে কসম খাওয়া প্রমাণিত হচ্ছে, অথচ আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাবার নামে কসম করতে নিষেধ করেছেন। কসম আল্লাহ্র নামে করতে হয়।
উত্তরে বলা হয় যে, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কসম খাওয়া এটা অভ্যাস মোতাবেক। কেন না আরবের লোকজন এভাবে কসম খাওয়ার অভ্যস্ত ছিলেন। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এটা কারও সম্মানের জন্য কসম করেননি বা তখন এভাবে কসম খাওয়া নিষেধ হয়নি। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যের নামে কসম করা এজন্য নিষেধ যে, আল্লাহর সামনে কারও স্থান না দেওয়া। কতক আলিমের নিকট এটা ছিল আল্লাহ ভিন্ন অন্যের নামে কসম নিষিদ্ধ হবার পূর্বের ঘটনা। (নাবাবী)
#আরও পড়ুন: সূরা আল-ফাতিহা : আরবি, বাংলা উচ্চারণ, ইংরেজি উচ্চারণ এবং অর্থসহ বিশদ ব্যাখ্যা
আনাস ইবনু মালিক (রা:) হতে বর্ণিত:
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করার ব্যাপারে আমাদের নিষেধ করা হয়েছিল। আমরা নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত হয়েছিলাম, তাই আমরা চাইতাম যে, গ্রাম থেকে কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি এসে তাঁকে প্রশ্ন করুক আর আমরা তা শুনি। তারপর একদিন গ্রাম থেকে এক ব্যক্তি এসে রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলল, হে মুহাম্মাদ! আমাদের কাছে আপনার দূত এসে বলেছে, আপনি দাবি করেছেন যে, আল্লাহ আপনাকে রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছে। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, সে সত্য বলেছে।
আগন্তুক বলল, আসমান কে সৃষ্টি করেছেন? তিনি বললেন, আল্লাহ। আগন্তুক বলল, জমিন কে সৃষ্টি করেছেন? রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আল্লাহ। আগন্তক বলল, এসব পর্বতমালা কে স্থাপন করেছেন এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে তা কে সৃষ্টি করেছেন? রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আল্লাহ।
আগন্তুক বলল, কসম সে সত্তার! যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং এসব পর্বতমালা স্থাপন করেছেন। আল্লাহই, আপনাকে রাসূল রূপে পাঠিয়েছেন? রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, হ্যাঁ। আগন্তুক বলল, আপনার দূত বলেছে যে, আমাদের ওপর আমাদের মালের যাকাত দেওয়া ফরজ। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: ঠিকই বলেছে। আগন্তুক বলল, যিনি আপনাকে রাসূল রূপে পাঠিয়েছেন, তাঁর কসম, আল্লাহই কি আপনাকে এ নির্দেশ দিয়েছেন? রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, হ্যাঁ।
আগন্তুক বলল, আপনার দূত বলেছে যে, আমাদের মধ্যে যে বাইতুল্লায় যেতে সক্ষম তার ওপর হজ ফরজ। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, সত্যি বলেছে। রাবী বলেন যে, তারপর আগন্তুক চলে যেতে যেতে বলল, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর কসম, আমি এর অতিরিক্তও করব না এবং এর কমও করব না। এ কথা শুনে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, লোকটি সত্য বলে থাকলে অবশ্যই সে জান্নাতে যাবে।
(ই. ফা. ১০; ই. সে. ১০)
- প্রশ্নকারী নবম হিজরিতে নবি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসেছিল। তাঁর নাম যিমাম ইবনু সালাবাহ্। সে বানু সা’দ ইবনু বাক্র গোত্রের লোক ছিল। সে ব্যক্তি সত্যপরায়ণাতায় জান্নাতী; এ কথাই রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জানিয়ে দিয়েছেন। কিংবা রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওই ব্যক্তির প্রশ্ন ও দৃঢ় প্রত্যয় দেখে আত্মবিশ্বাস থেকে এ কথা বলেছেন।
সোর্স: আই হাদিস

![ঈমান, ইসলাম ও তাকদীর সম্পর্কে হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ [সহিহ মুসলিম ১-১০]](https://i0.wp.com/hadithghor.com/wp-content/uploads/2025/05/Sahih-Muslim-1-10.jpg?fit=1024%2C536&ssl=1)

![হাদিস ও পবিত্রতার শিক্ষা: সুনান আন-নাসাই থেকে ত্বহারাহ্ [পর্ব: ০১]](https://i0.wp.com/hadithghor.com/wp-content/uploads/2025/07/Hadith-O-Probitrotar-Shikkha.jpg?fit=1024%2C536&ssl=1)