ইসলাম কি বৈবাহিক ধর্ষণের অনুমতি দেয়? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা জানার চেষ্টা করব, আজকের এই— আর্টিকেলে। চলুন তাহলে— ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ও হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা জানা যাক।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ও হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
“যখন কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে তার শয্যায় আহ্বান করে (দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য), আর স্ত্রী যদি তা প্রত্যাখ্যান করে এবং স্বামী তার ওপর রাগ করে রাত কাটায়, তবে ফেরেশতারা তাকে (স্ত্রীকে) সকাল পর্যন্ত লানত করতে থাকে।” (সহিহ বুখারি: ৩২৩৭, সহিহ মুসলিম: ১৪৩৬)
এই হাদিসটি সহিহ এবং এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী। তবে এর সঠিক ব্যাখ্যা এবং প্রেক্ষাপট না বুঝে অনেকেই এটি নিয়ে ভুল ধারণায় পড়েন এবং ভুল প্রচার করেন।
কিছু মানুষ এই হাদিসকে “বৈবাহিক ধর্ষণ” বৈধ করার যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন, যেখানে বলা হয়—“যেহেতু স্ত্রী সাড়া না দিলে ফেরেশতারা তাকে লানত দেয়, তাই স্বামী চাইলে জোর করতে পারে।”
কিন্তু বিষয়টা এমন নয়।
#আরও পড়ুন: আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.) : ইসলামের সাহসী সাহাবিদের একজন!
ইসলাম জোরজবরদস্তিকে অনুমোদন করে না
এই হাদিসে স্ত্রীকে জোর করার কোনো অনুমতি স্বামীকে দেওয়া হয়নি। বরং স্ত্রী যদি অহেতুক বা ইচ্ছেকৃতভাবে স্বামীর ন্যায্য আহ্বান উপেক্ষা করে, তবে তার জন্য আখিরাতে জবাবদিহিতা আছে— এই বার্তাই এখানে দেওয়া হয়েছে। বিচার করবে আল্লাহ, মানুষ নয়।
যদি স্বামীকে জোর করার অনুমতি দিয়ে থাকত, তাহলে হাদিসে বলা হতো: “স্বামী জোর করতে পারবে” বা “তাকে শাসন করতে পারবে”— কিন্তু তা বলা হয়নি। বরং বলা হয়েছে, স্বামী কষ্ট পেয়ে দূরে সরে থাকলে ফেরেশতারা লানত করেন।
ইসলাম পারস্পরিক সম্মতি ও সদ্ব্যবহারের ধর্ম
ইসলামে দাম্পত্য সম্পর্ক হলো রহমত, মহব্বত ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার জায়গা। কুরআন বলছে—
“আর তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের নিকট প্রশান্তি লাভ করো, আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন প্রেম ও দয়া।” (সূরা রূম: ২১)
এখানে কোথাও বলেইনি যে স্বামী চাইলে স্ত্রীকে বাধ্য করতে পারবে বা স্ত্রীকে সম্মতি ছাড়াই কিছু করার অধিকার তার আছে। বরং এমন করলে সেটা স্পষ্ট জুলুম হবে।
বিচার আল্লাহর হাতে, মানুষের নয়
যদি স্ত্রী অহেতুক, স্বামীর ভালো ব্যবহার থাকা সত্ত্বেও দাম্পত্য সম্পর্ক এড়িয়ে চলেন— তাহলে এটা দায়িত্বহীন আচরণ হতে পারে। তবে সেটার বিচার আল্লাহ করবেন। স্বামী জোর করতে পারবে এমন ধারণা হাদিস বা কুরআনের কোথাও নেই।
একবার ভেবে দেখুন— যদি এমন হতো, “স্বামী ডাকলেই স্ত্রীকে সাড়া দিতেই হবে, না হলে স্বামী জোর করতে পারবে”— তাহলে তো নারীরা জুলুমের শিকার হতেন প্রতিদিন, প্রতিটি ঘরে! অথচ ইসলামে জুলুমের কোনো স্থান নেই— সে স্বামী করুক, বা স্ত্রী।
#আরও পড়ুন: ঈমান, ইসলাম ও তাকদীর সম্পর্কে হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ [সহিহ মুসলিম ১-১০]
সুতরাং এই হাদিসকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে যে স্বামীরা নিজেদের অন্যায়কে বৈধতা দিতে চান এবং যে নারীরা ইসলামকে নারীবিদ্বেষী ধর্ম মনে করছেন— দুই পক্ষই ভুল করছেন।
ইসলাম নারীর সম্মান, অধিকার এবং নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্মান ও দায়িত্ববোধই ইসলামের দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি।
আল্লাহর রাসূলের হাদিসকে বুঝতে হবে প্রেক্ষাপট ও দয়া-ভিত্তিক ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে। বিচারের ভার যিনি রেখেছেন, তিনি চরম জ্ঞান ও দয়ার অধিকারী— তিনি আল্লাহ। কোনো পক্ষই নিজের সুবিধামতো ইসলামের ব্যাখ্যা দিতে পারে না।
আল্লাহপাক, আমাদের সবাইকে সঠিক বোঝার তৌফিক দান করুন। আমিন।

