আজ আমরা এমন এক ভূমি নিয়ে কথা বলব যেখানে সাগর, মরুভূমি আর উর্বর উপত্যকার মিশেলে গড়া এক জায়গা। যাকে বিশ্ববাসী ফিলিস্তিনি নামে চেনে। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলকে বলা হতো “কনান” বা “লেভান্ট”। এর অবস্থান এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের মাঝামাঝি। ফলে এখান দিয়ে বয়ে গেছে রেশম পথ (Silk Road)-এর শাখা, লোহিত সাগরের বন্দর, আর মরুভূমির ক্যারাভান রুট। চোখ বন্ধ করে একবার কল্পনা করুন – রাতের আকাশে একটি ছোটো নৌকা ভূমধ্যসাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে দোল খাচ্ছে। ওপাশে আলোকিত গাজার উপকূল দেখা যাচ্ছে। দূরে, পাহাড়ের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে জেরুজালেম, যেন এক নীরব দর্শক, যুগ যুগ ধরে সবকিছু প্রত্যক্ষ করে চলেছে। ফিলিস্তিনের প্রতিটি ইঞ্চি মাটিতে রয়েছে ইতিহাসের গভীর চিহ্ন, যা রাজা-সুলতান, নবী-দার্শনিক, যুদ্ধ-বিজয় আর পরাধীনতার গল্প বলে। কিন্তু কেন এই ভূমি এত গুরুত্বপূর্ণ? কেন যুগে যুগে রাজারা, শাসকরা এই ভূখণ্ডের দখল নিতে চেয়েছেন? ফিলিস্তিনের ভৌগোলিক রহস্য কী? কেন এই ছোট্ট ভূমি বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু? চলুন তবে আজ সেই ইতিহাসই আপনাদের জানাই।
ফিলিস্তিনের ভৌগোলিক রহস্য: কেন এই ছোট্ট ভূমি বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু?
ফিলিস্তিনের ভৌগোলিক অবস্থান: পৃথিবীর ক্রসরোড
ফিলিস্তিনের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড। এটি এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার সংযোগস্থলে অবস্থিত, যা একে প্রাচীন ও আধুনিককালের অন্যতম কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলেছে।
ফিলিস্তিনের পূর্বে রয়েছে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, জর্দান ও সৌদি আরব। পশ্চিমে আছে আফ্রিকার আরব দেশ মিসর। এই পুরো অঞ্চল তেলসমৃদ্ধ। ফিলিস্তিনের উত্তর-পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর। যার তীরে সাইপ্রাস, তুরস্ক, গ্রিসসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো অবস্থিত। ইউরোপ থেকে সড়কপথে আফ্রিকা যেতে হলে ফিলিস্তিনই একমাত্র রাস্তা।
ফিলিস্তিনের প্রধান অঞ্চলসমূহ:
পশ্চিম তীর (West Bank): এটি জর্ডান নদীর পশ্চিমে অবস্থিত। জেরুজালেম শহর এবং অনেক ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থান এখানে রয়েছে। বর্তমানে ইসরাইল এই অঞ্চলের বিশাল অংশ দখল করে বসতি স্থাপন করেছে।
গাজা উপত্যকা (Gaza Strip): এটি ভূমধ্যসাগরের তীরে একটি ছোটো উপত্যকা। এখানে প্রায় ২৩ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করে। ইসরাইল ২০০৭ সাল থেকে গাজার ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করেছে।
জেরুজালেম (Jerusalem): এটি ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম শহর (মক্কা ও মদিনার পরে)। খ্রিস্টান ও ইহুদিদের জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর। ইসরাইল পুরো জেরুজালেমকে তাদের রাজধানী দাবি করলেও আন্তর্জাতিকভাবে এটি বিতর্কিত।
ফিলিস্তিন: সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের সেতুবন্ধন
ফিলিস্তিন শুধুমাত্র একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি হাজার বছরের ইতিহাস, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও যুদ্ধের মিলনস্থল। বিশ্বের প্রাচীনতম মানব বসতিগুলোর একটি হিসেবে ফিলিস্তিন বহু সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের সাক্ষী। মেসোপটেমিয়া, মিশর, গ্রিক, রোমান, ইসলামি খেলাফত এবং আধুনিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর প্রভাব একে ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কানানীয় সভ্যতা (৩০০০ খ্রিস্টপূর্ব)
- ফিলিস্তিন অঞ্চল তখন “কানান” নামে পরিচিত ছিল এবং কানানীয়রা এখানে বসবাস করত।
- তারা কৃষি ও বাণিজ্যের মাধ্যমে সমৃদ্ধ একটি সভ্যতা গড়ে তোলে।
- এই সময় জেরুজালেমের প্রাথমিক নগরকেন্দ্রের বিকাশ ঘটে।
মিশরীয় প্রভাব (১৫০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্ব)
- মিশরীয় ফারাওরা ফিলিস্তিনের বিভিন্ন অংশ নিয়ন্ত্রণ করত এবং এখানকার বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।
- মিশরীয় স্থাপত্য ও লিপির প্রভাব ফিলিস্তিনের বিভিন্ন নিদর্শনে দেখা যায়।
ইসরায়েলীয় রাজত্বের দাবিকৃত সময়কাল (১০০০-৫৮৬ খ্রিস্টপূর্ব)
- ইহুদিরা দাবি করে যে, এই সময়ে দাউদ (ডেভিড) ও সলোমনের (সুলায়মান) রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জেরুজালেমে প্রথম মন্দির নির্মিত হয়।
- যদিও এর ঐতিহাসিক প্রমাণ বিতর্কিত, তবু এটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।
আসিরীয় ও ব্যাবিলনীয় শাসন (৭২২-৫৩৯ খ্রিস্টপূর্ব)
- আসিরীয়রা প্রথমে উত্তর ফিলিস্তিন দখল করে, পরে ব্যাবিলনীয়রা দক্ষিণ অংশ দখল করে নেয়।
- ৫৮৬ খ্রিস্টপূর্বে ব্যাবিলনীয় রাজা নবূচাদনেজার (Nebuchadnezzar) জেরুজালেম ধ্বংস করে ও ইহুদিদের বন্দি করে ব্যাবিলনে নিয়ে যায়।
আলেকজান্ডারের বিজয় (৩৩২ খ্রিস্টপূর্ব)
- ফিলিস্তিন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং হেলেনিস্টিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে।
রোমান দখল ও খ্রিস্টধর্মের বিকাশ (৬৩ খ্রিস্টপূর্ব – ৩৯৫ খ্রিস্টাব্দ)
- রোমানরা ফিলিস্তিন দখল করে এবং এটিকে “জুডিয়া” নামে পরিচিত করে।
- খ্রিস্টধর্মের প্রতিষ্ঠাতা যীশু খ্রিস্ট এই সময় ফিলিস্তিনে জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁর ধর্ম প্রচার শুরু করেন।
- ৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমানরা জেরুজালেমের দ্বিতীয় মন্দির ধ্বংস করে এবং ইহুদিদের দেশ ছাড়া করে।
বাইজেন্টাইন যুগ (৩৯৫-৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ)
- রোমান সাম্রাজ্য বিভক্ত হলে ফিলিস্তিন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অংশ হয় এবং খ্রিস্টধর্ম এখানকার প্রধান ধর্ম হয়ে ওঠে।
খলিফা উমর (রাঃ)-এর বিজয় (৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ)
- বাইজেন্টাইনদের পরাজিত করে মুসলমানরা ফিলিস্তিন দখল করে।
- খলিফা উমর (রাঃ) শান্তিপূর্ণভাবে জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন।
- এই সময় আল-আকসা মসজিদ ও ডোম অফ রক নির্মিত হয়।
উমাইয়া, আব্বাসীয় ও ফাতিমীয় শাসন (৬৬১-১০৯৯ খ্রিস্টাব্দ)
- ফিলিস্তিন মুসলিম সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে এবং বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও স্থাপত্যের বিকাশ ঘটে।
ক্রুসেড ও সালাহউদ্দিন আইউবির পুনরুদ্ধার (১০৯৯-১১৮৭ খ্রিস্টাব্দ)
- ১০৯৯ সালে ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করে এবং মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চালায়।
- ১১৮৭ সালে মুসলিম বীর সালাহউদ্দিন আইউবি জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেন।
অটোমান সাম্রাজ্যের শাসন (১৫১৭-১৯১৭ খ্রিস্টাব্দ)
- অটোমানরা প্রায় ৪০০ বছর ফিলিস্তিন শাসন করে।
- মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদিরা এই সময় একসঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করত।
ব্রিটিশ দখল (১৯১৭-১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ)
- প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশরা অটোমানদের পরাজিত করে ফিলিস্তিন দখল করে।
- ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণা অনুযায়ী ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়।
ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম ও ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ (১৯৪৮)
- ব্রিটিশ শাসনের পর ফিলিস্তিনের বিশাল অংশ ইহুদিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
- ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনিকে উচ্ছেদ করা হয়, যা ‘নাকবা’ (বিপর্যয়) নামে পরিচিত।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও প্রতিরোধ
- ১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধে ইসরাইল পশ্চিম তীর, গাজা ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয়।
- আজও ফিলিস্তিনি জনগণ নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।
#আরও পড়ুন: রোজার শেষ দশ দিন: রহমত, মুক্তি ও আত্মশুদ্ধির শ্রেষ্ঠ সময়
ফিলিস্তিনের কৌশলগত গুরুত্ব: কেন এই ভূমির জন্য সংঘাত?
ফিলিস্তিনের ভূমি কেবলমাত্র একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, এটি হাজার বছরের পুরনো এক রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় কেন্দ্র। যুগে যুগে বিভিন্ন সাম্রাজ্য, শক্তিধর দেশ এবং ধর্মীয় সম্প্রদায় এই ভূমি নিয়ন্ত্রণের জন্য সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে।
ধর্মীয় গুরুত্ব: তিনটি প্রধান ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু
ফিলিস্তিন বিশ্বের তিনটি প্রধান ধর্ম—ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম ও ইহুদিধর্মের জন্য পবিত্র স্থান। ধর্মীয় গুরুত্বের কারণেই যুগে যুগে এই ভূমির দখল নিয়ে লড়াই হয়েছে এবং আজও এই লড়াই চলছে।
ইসলামে ফিলিস্তিনের গুরুত্ব: ফিলিস্তিন ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান। মক্কা ও মদিনার পরে মুসলমানদের কাছে জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন অনুযায়ী, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মেরাজে যাওয়ার সময় আল-আকসা মসজিদ থেকেই ঊর্ধ্বগমন করেন। মুসলমানদের প্রথম কিবলা ছিল এই মসজিদ।
খ্রিস্টধর্মে ফিলিস্তিনের গুরুত্ব: খ্রিস্টধর্ম মতে, যীশু খ্রিস্ট ফিলিস্তিনে জন্মগ্রহণ করেন এবং এখানেই তাঁর কার্যক্রম পরিচালিত হয়। যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়া, পুনরুত্থান এবং খ্রিস্টধর্মের প্রতিষ্ঠা জেরুজালেমে ঘটে। বর্ণিত হয় যে, যীশু খ্রিস্ট দ্বিতীয়বার পৃথিবীতে ফিরে আসবেন এবং সেটিও এই অঞ্চলে হবে।
ইহুদিধর্মে ফিলিস্তিনের গুরুত্ব: ইহুদিরা বিশ্বাস করে যে, ফিলিস্তিন তাদের পূর্বপুরুষদের প্রতিশ্রুত ভূমি। তারা মনে করে এখানেই তাদের প্রথম ও দ্বিতীয় মন্দির ছিল, যা রোমান সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দেয়। ইহুদিরা আল-আকসা মসজিদের নিচে ‘সলোমনের মন্দির’ ছিল বলে দাবি করে এবং সেখানে পুনরায় মন্দির নির্মাণ করতে চায়।
ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব
ফিলিস্তিন এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার সংযোগস্থলে অবস্থিত, যা এটিকে একটি কৌশলগত অবস্থানে পরিণত করেছে। ইতিহাস জুড়েই এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
প্রাচীন বাণিজ্য পথের কেন্দ্রবিন্দু:
- ফিলিস্তিন প্রাচীনকালে ‘সিল্ক রোড’ এবং ‘স্পাইস রোড’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান:
- ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী হওয়ায় এখানে একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব।
- দক্ষিণে মিশর, উত্তরে লেবানন, পূর্বে জর্ডান ও পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর থাকায় এটি একটি কৌশলগত ‘চোকপয়েন্ট (Chokepoint)’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রাকৃতিক সম্পদ ও জ্বালানি:
ফিলিস্তিন নিজে তেলসমৃদ্ধ না হলেও, এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোর সংযোগস্থলে অবস্থিত। ২০০০ সালে ভূমধ্যসাগরে আবিষ্কৃত Marine Gas Field-এ প্রায় ১.৪ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাসের মজুদ রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার।
গ্যাসক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ: অর্থনৈতিক স্বাধিকার বনাম দখলদারিত্ব
- গাজার উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচুর প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে, যা ফিলিস্তিনের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত।
- তবে, ইসরাইল এই গ্যাসক্ষেত্রের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যাতে ফিলিস্তিন স্বাধীনভাবে অর্থনৈতিক উন্নতি করতে না পারে।
তেল রুটের কৌশলগত গুরুত্ব
- মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস ইউরোপ ও আমেরিকায় সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইনগুলো এই অঞ্চলের পাশ দিয়ে যায়।
- যে দেশ এই রুটগুলো নিয়ন্ত্রণ করে, সে বিশ্ববাজারে শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
পানি সংকট:
ফিলিস্তিনের পানি সংকট এটিকে আরও সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত করেছে। বিশ্বে সবচেয়ে কম পানি সরবরাহপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর একটি ফিলিস্তিন— যেখানে একজন ফিলিস্তিনি দৈনিক গড়ে মাত্র ৭০ লিটার পানি পায়, অথচ ইসরাইলি নাগরিক পায় ৩০০ লিটার।
পশ্চিম তীর ও জর্ডান নদীর পানি সংকট
- পশ্চিম তীরের ভূগর্ভস্থ জলাধার ও জর্ডান নদী অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পানির উৎস।
- ইসরাইল এসব পানির উৎসের বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করে এবং ফিলিস্তিনিদের প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে সীমিত করেছে।
- জর্ডান নদীর ৮৫% পানি ইসরাইল ব্যবহার করে, ফিলিস্তিন পায় মাত্র ১৫%।
- ১৯৬৭ সালে ইসরাইল গোলান হাইটস দখল করে বানিয়াস নদীর উৎস নিয়ন্ত্রণ নেয়।
- গাজার ৯৫% পানি দূষিত, এবং ইসরাইলের অবরোধের কারণে পানিশোধন প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে।
- জাতিসংঘ পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে গাজায় সুপেয় পানি সম্পূর্ণ ফুরিয়ে যাবে।
অবরোধের নেপথ্য কারণ
- ইসরাইল আশঙ্কা করে, হামাস গ্যাস বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, যা তারা মেনে নিতে চায় না।
- মিশর ও ইসরাইল যৌথভাবে গাজার ওপর অবরোধ আরোপ করেছে, যাতে হামাস গ্যাস রপ্তানি করে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে না পারে।
আন্তর্জাতিক কোম্পানির আগ্রহ ও সংকট
- ব্রিটিশ BG Group ও ইসরাইলি Delek Drilling গ্যাস উত্তোলনের চুক্তি করতে চেয়েছিল, তবে সংঘাতের কারণে সেটি বন্ধ হয়ে যায়।
- পশ্চিমা শক্তিগুলোর স্বার্থ এবং ইসরাইলের ভূরাজনৈতিক কৌশল ফিলিস্তিনের সম্পদকে ফিলিস্তিনিদের হাতছাড়া করার অন্যতম কারণ।
আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ
ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে আমেরিকান আধিপত্য
১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ফিলিস্তিন দখল করে এবং বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ইহুদিদের জন্য একটি রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দেয়। এর পর থেকে পশ্চিমা শক্তিগুলো, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইলকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে আসছে। এটি তাদের মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বজায় রাখার একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরাইল জোট
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে তাদের ‘ফরোয়ার্ড বেস’ হিসেবে ব্যবহার করে। ইসরাইলকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে নিজের প্রভাব বজায় রাখে এবং মুসলিম বিশ্বকে বিভক্ত ও দুর্বল রাখার নীতি অনুসরণ করে।
আরব দেশগুলোর নিষ্ক্রিয়তা ও বিভক্তি
আরব দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও দুর্বল নেতৃত্বের কারণে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কিছু দেশ ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে, যা ফিলিস্তিনিদের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আঘাত।
ফিলিস্তিন শুধুমাত্র একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি হাজার বছরের ইতিহাস, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও যুদ্ধের মিলনস্থল। এই ভূমি বিশ্বের প্রাচীনতম মানব বসতির মধ্যে একটি, যেখানে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন ঘটেছে এবং সভ্যতার বিকাশের ধারায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
#আরও পড়ুন: ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম এবং ফিলিস্তিনিদের গণনির্বাসনের (নাকবা) ইতিহাস!
ফিলিস্তিন কি কখনো শান্তি পাবে?
এখন প্রশ্ন হলো, ফিলিস্তিন কি কখনো শান্তি পাবে?
ফিলিস্তিনের ভৌগোলিক গুরুত্ব এতটাই যে বিশ্বশক্তি কেউ এটিকে পুরোপুরি ছাড় দেবে না। রাশিয়া-চীন-মার্কিন স্বার্থ জড়িয়ে আছে এখানে। আবার, তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলোর জন্য ফিলিস্তিন ইস্যু হলো “আরব ঐক্যের প্রতীক”। ফিলিস্তিন শুধুমাত্র এক ভূখণ্ড নয়, এটি এক জাতির পরিচয়, ইতিহাসের সাক্ষ্য এবং মানবাধিকারের এক দীর্ঘ লড়াই। যুগে যুগে ফিলিস্তিনের মানুষ নিজেদের জমি, সংস্কৃতি ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করেছে। আজও প্রতিদিন, গাজার কোনো এক শিশু হয়তো যুদ্ধবিমানের শব্দ শুনে ঘুম ভাঙায়, পশ্চিম তীরের কোনো বৃদ্ধ হয়তো নিজের জমি হারিয়ে হাহাকার করে, আর বিশ্ব দেখেও দেখে না। এই ভূখণ্ড শুধু মানচিত্রে নয়, মানুষের হৃদয়ে গাঁথা এক ইতিহাস, যা এখনও লেখা হচ্ছে।
তবে ইতিহাস সাক্ষী যে, ফিলিস্তিনের মাটি বারবার দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।
নোট: “ফিলিস্তিনের ভৌগোলিক রহস্য” শীর্ষক এই আর্টিকেলটি প্রস্তুত করতে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র; যেমন- গবেষণাপত্র, ঐতিহাসিক দলিল, ইসলামিক পাণ্ডুলিপি, এবং বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইটের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।




You are doing well. Never read such in depth article in bengali on this topic before! Keep it up…!!