ইসলামিক পরিচ্ছন্নতা ও ইস্তিঞ্জার আদব আমরা অনেকেই জানি না বা জানলেও পূর্ণাঙ্গভাবে পালন করি না। ইসলাম শুধু নামাজ, রোজা, হজ্জ নয় – বরং একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। এখানকার প্রতিটি কাজেরই রয়েছে সৌন্দর্য ও শালীনতার নির্দেশনা। এমনকি পায়খানা-প্রস্রাবের মতো স্বাভাবিক কাজেও রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ শিক্ষা।
সুনান আন-নাসায়ী-এর ত্বহারাহ্ অধ্যায়ে এমনই কিছু মূল্যবান হাদীস আপনাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে, যা আমাদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও আখলাকের শিক্ষা দেয়।
ইসলামিক পরিচ্ছন্নতা ও ইস্তিঞ্জার আদব সম্পর্কিত পূর্ণাঙ্গ আলোচনাঃ
হাড় ও গোবর দিয়ে কুলুখ নিষিদ্ধ
হাদীস ৩৯-৪০:
রাসূল (সা.) হাড় এবং শুকনো গোবর দিয়ে ইস্তিঞ্জা (কুলুখ) করতে নিষেধ করেছেন। কারণ এগুলো অপবিত্র এবং কিছু হাদীসে উল্লেখ আছে, এগুলো জিনের খাবার।
ইস্তিঞ্জার নিয়ম: সংখ্যা ও উপকরণ
হাদীস ৪১-৪৪:
তিনটির কম কুলুখ ব্যবহার না করতে বলা হয়েছে।
অপ্রয়োজনে একটি ঢিলা দিলেও চলবে, তবে বিজোড় হওয়া উত্তম।
শুধুমাত্র ঢিলা ব্যবহার করে ইস্তিঞ্জা বৈধ, যদি তা পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করে।
পানি ব্যবহারই সর্বোত্তম।
পানি দিয়ে ইস্তিঞ্জার ফজিলত
হাদীস ৪৫:
রাসূল (সা.) প্রায়শই পানির সাহায্যে ইস্তিঞ্জা করতেন। এমনকি ছোট ছেলেরা তাঁর জন্য পানি নিয়ে যেত।
ডান হাত ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা
হাদীস ৪৭-৪৯:
ইস্তিঞ্জা বা শৌচকার্যে ডান হাত ব্যবহার না করতে বলা হয়েছে। কারণ ডান হাত দ্বারা খাওয়া, করমর্দন ইত্যাদি সম্মানজনক কাজ করা হয়।
ইস্তিঞ্জার পর হাত পরিষ্কার
হাদীস ৫০-৫১:
ইস্তিঞ্জার পর রাসূল (সা.) হাত মাটিতে ঘষে পরিষ্কার করতেন। এটা এক ধরনের জীবাণুমুক্ত করার উপায় হিসেবে বিবেচিত।
পানির পরিমাণ ও পবিত্রতা
হাদীস ৫২:
যদি পানি দুই কুল্লার মতো পরিমাণে হয়, তাহলে তা সহজে অপবিত্র হয় না। চতুষ্পদ প্রাণীর ব্যবহারকৃত পানির ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য।
ইসলামিক পরিচ্ছন্নতা ও ইস্তিঞ্জার আদব মসজিদে প্রস্রাব করা ও রাসূল (সা.)-এর নম্রতা
হাদীস ৫৩-৫৬:
এক বেদুঈন ব্যক্তি মসজিদে প্রস্রাব করলে লোকেরা রাগ করলেও রাসূল (সা.) তাকে বাধা দেননি। বরং, পরে একটি বালতি পানি ঢেলে পরিষ্কার করতে বলেন। এতে নম্রতা ও ধৈর্যের অনুপম শিক্ষা পাওয়া যায়।
আবদ্ধ পানিতে প্রস্রাব নিষেধ
হাদীস ৫৭-৫৮:
আবদ্ধ পানিতে প্রস্রাব না করার নির্দেশ দিয়েছেন রাসূল (সা.)। কারণ এই পানি দিয়ে ওযু বা গোসল করলে তা পবিত্র থাকবে না।
সমুদ্রের পানি ও মৃত প্রাণী
হাদীস ৫৯:
রাসূল (সা.) বলেন, “সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং মৃত প্রাণী হালাল।” এটি জাহাজ ভ্রমণ বা সমুদ্রপথে যাতায়াতকারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধান।
বরফ ও শিশির দ্বারা পবিত্রতা অর্জন
হাদীস ৬০:
নবী (সা.) তাঁর দোয়ার মধ্যে গুনাহ থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য বরফ, পানি ও শিশির ব্যবহারের কথা বলেন। এর মাধ্যমে অন্তরের পরিচ্ছন্নতা ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা পাওয়া যায়।
ইসলামিক পরিচ্ছন্নতা ও ইস্তিঞ্জার আদব এর সারাংশ: রাসূল (সা.) এর পরিচ্ছন্নতার আদর্শ
অপবিত্র বস্তু দিয়ে কুলুখ করা নিষিদ্ধ
ইস্তিঞ্জার সময় ডান হাত ব্যবহার নিষেধ
তিনটি বা বিজোড় সংখ্যক ঢিলা ব্যবহার করা উত্তম
পানির ব্যবহার সর্বোত্তম এবং তা নির্দিষ্ট পরিমাণে পবিত্র থাকে
নম্রতা ও ধৈর্য ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য
সমুদ্রের পানি ও বরফও পরিচ্ছন্নতার উৎস হতে পারে
ইসলাম আমাদের শেখায়, কীভাবে সুন্দরভাবে জীবন যাপন করতে হয় – শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্রতা বিষয়ক শিক্ষাগুলো অনুসরণ করলে আমরা শুধু শারীরিক নয়, বরং আত্মিকভাবে পরিচ্ছন্ন হতে পারি।
পরিশেষে, প্রতিটি মুসলমানের উচিত ইসলামিক পরিচ্ছন্নতা ও ইস্তিঞ্জার আদবসহ এসব সুন্নাহ জানা এবং নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা।

